Home ইভেন্ট নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স: বিআইজিএফ গোলটেবিল

নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স: বিআইজিএফ গোলটেবিল

আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স-সংক্রান্ত অঙ্গীকার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে এক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (বিআইজিএফ)। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর বনানীর হোটেল সারিনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনার শিরোনাম ছিল- “দলীয় ইশতেহারে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সম্পর্কিত অঙ্গীকার”।

গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ, নাগরিক অধিকার, নির্বাচনোত্তর নীতিগত অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ প্রণয়নের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে একটি যৌথ বোঝাপড়া তৈরি, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এসব বিষয় কতটা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন সেসব নিয়ে জনআলোচনা ও নীতিনির্ধারণে সহায়ক কিছু ঐকমত্যভিত্তিক সুপারিশ তুলে ধরা।

আলোচনায় ডিজিটাল অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি, সাশ্রয়ী ও অর্থবহ ইন্টারনেট সংযোগ, তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের অখণ্ডতা, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, উদ্ভাবন ও দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পাশাপাশি ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

আম্বার আইটি লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে শিক্ষক, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইজিএফ-এর ভাইস চেয়ারপার্সন মো সাইমুম রেজা তালুকদার। বিআইজিএফ-এর নির্বাহী সদস্য শারমিন খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিআইজিএফ চেয়ারপার্সন আমিনুল হাকিম, মহাসচিব মোহাম্মদ আব্দুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. রকিবুল হক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার এ. মামুন, বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক জনাব মারুফ মল্লিক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্বো)-এর মহাসচিব ফয়সাল আলিম, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিকি)-এর নির্বাহী পরিচালক টি.আই.এম. নুরুল কবির, ভিউজ বাংলাদেশের সম্পাদক রাশেদ মেহেদী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলননের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া, বাংলাদেশ উইমেন ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের চেয়ারপার্সন শামিমা আক্তার, বাংলাদেশ ইয়ুথ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের চেয়ারপার্সন সৈয়দা কামরুন জাহান রিপা, জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও আগ্রাবাদ গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইরাদ আলী, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) –এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ পারভেজ আলম, ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেডের চিফ অব গভর্মেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার আব্বাস ফারুক, বিআইজিএফ’র নির্বাহী সদস্য ড. জামিল আহমেদ প্রমুখ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক জনাব একেএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮০ দিনের একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এ সময় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিগত সরকাগুলোর বরাদ্দ ও ব্যয়ের ওপর অডিট পরিচালনা করা হবে এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালাগুলো পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নের কথাও জানান তিনি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। ইন্টারনেট ব্যবহারে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার সুরক্ষায় কিছু নির্দিষ্ট ডিজিটাল সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। এছাড়াও, আইসিটি সেক্টরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, সমন্বয় ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৯০% শতাংশ জনগোষ্ঠীকে সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে ওনার দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি ।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া বলেন, আইন নাকি প্রতিষ্ঠান আগে—কোনটি অগ্রাধিকার পাবে তা স্পষ্ট করা দরকার। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সেগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। শুরু থেকেই আমরা মানুষের পক্ষে ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়েছি। দমন, নিপীড়ন ও পাচার-সহায়ক আইন বাতিল বা সংস্কার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিচার, সংস্কার কিংবা বিলুপ্তির দাবিও আমাদের, যা আমাদের মেনিফেস্টোতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

কানাডা সরকারের জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র প্রজেক্ট কর্মকর্তা গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজিম বলেন, গত ১৫ বছর এটুআই বা অন্যান্য এজেন্সি কি অর্জন করলো এবং কোথায় আমরা দাড়িয়ে আছি, ভুল কি কি ছিল তার স্টক-টেকিং বা ইভালুয়েশন করা খুবই জরুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. রকিবুল হক বলেন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের একটি বড় অংশ হলো ডাটা গভর্ন্যান্স। ডাটার মালিকানা কার—এ বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। এক দেশ থেকে অন্য দেশে ডাটা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে নীতিমালা ও মালিকানা কাঠামো পরিষ্কার থাকা উচিত।

জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও আগ্রাবাদ গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইরাদ আলী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তি নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (এসওএফ) ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই তহবিল সুবিধাবঞ্চিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে তা ব্যয় হচ্ছে-তা স্পষ্ট নয়।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার এ. মামুন বলেন, দেশের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত এআই নীতি, কৌশল ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এটি ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেডের চিফ অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার আব্বাস ফারুক ভবিষ্যতে গ্রিন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক মারুফ মল্লিক বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে প্রযুক্তিগত সমন্বয় সাধন ও সামষ্টিক আইসিটি সেবা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওনার মতে আইসিটি খাত সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া উচিত।

সমাপনী বক্তব্যে বিআইজিএফ চেয়ারপার্সন আমিনুল হাকিম বলেন, উপযুক্ত নীতিমালার অভাবে ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তিনি বলেন, ইন্টারনেট খাতে পর্যাপ্ত রিডানডেন্সি ও সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো না থাকলে বড় বিনিয়োগ আসবে না। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অন্তত পাঁচ থেকে ১০টি সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজন রয়েছে। এসব বিষয়ে বর্তমান ও আগামী সরকারকে গভীর মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানের শেষে তিনি গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

Exit mobile version