ফেসবুক বন্ধের কারনে চরম সংকটে ই-কমার্স খাত

ফেসবুক বন্ধের কারনে চরম সংকটে ই-কমার্স খাত

দেশের ই-কমার্স এখনো হাটি হাটি পা করে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষ যদিও এখনো অনলাইনে কেনা কাটা করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি, তারপরও এ খাতে অগ্রগতি লক্ষণীয়। ই-ক্যাবের মতে অনলাইনে প্রতি মাসে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ প্রসঙ্গে বলেছেন, “দেশের স্বার্থেই আপাতত ফেসবুকসহ কয়েকটি মাধ্যম বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থা আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই নির্দেশ পাওয়া মাত্র খুলে দেয়া হবে।“ ব্যবসায়ীদের ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ ই-কমার্সে কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে এটা সত্য, তবে দেশের সার্বিক নিরাপত্তার কথাও সবাইকে চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের উচিত হবে, শুধু ফেসবুক নির্ভর না হয়ে নিজস্ব সাইট ডেভেলপ করার পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের অন্য ডিজিটাল উপায় খুঁজে বের করা।” একই সাথে তিনি ব্যবসায়ের জন্য ফেসবুকের উপর বেশি নির্ভরশীল না হতেও পরামর্শ দিয়েছেন।

ফেসবুক বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তথ্য প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, “আমি কোনো অবস্থাতেই প্রযুক্তি বন্ধের পক্ষপাতী নই। প্রযুক্তিকে প্রযুক্তি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। এসব মাধ্যম বন্ধের আদৌ কোনো সুফল এসেছে কি না, জানি না। অনেকেই এগুলো বিকল্প উপায়ে ব্যবহার করছে, কিন্তু সরকার বদনাম কুড়াচ্ছে। লাখ লাখ ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা টিকে আছে, তাদের গলা টিপে মারার কোনো মানে হয় না।”

ফেসবুক অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে এখন এই মাধ্যম আর যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যমও এখন ফেসবুক। দেশের ই-কমার্স এর উপর গবেষণা না হওয়াতে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারনা করা হয়, দেশে ১৫০০ র বেশি ই-কমার্স সাইট এবং ৩০০০ হাজারেরও বেশি ফেসবুক পেইজ ভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ই-কমার্সের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর রয়েছে ৩০০ এর বেশি নিবন্ধিত সদস্য। দেশের সকল ই-কমার্স সাইটগুলোরই ফেসবুকে রয়েছে ব্যবসায় পেইজ। এসব পেইজ থেকে এরা তাদের ভিজিটর ও বিক্রির উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পেয়ে থাকে। এসব সাইটের ভিজিটর ও বিক্রি কমে গেছে ৬০% থেকে ৭০%। আর যেসব উদ্যোগ শুধুমাত্র ফেসবুক নির্ভর তাদের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। যেখানে বিক্রি ৯৯% বা তারও বেশি কমে গেছে।

সরাসরি ব্যবসায় ছাড়াও কুরিয়ার, পেমেন্ট গেটওয়ে, পাইকার, ব্যাংকিং এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১ লাখ মানুষ। গত ৩ সপ্তাহে যাদের আয় রোজগারের পথ বন্ধ।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর প্রেসিডেন্ট রাজীব আহমেদ বলেন, “নিরাপত্তা আমাদের দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এতে কোন সন্দেহ নেই তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুক বন্ধ থাকার ফলে দেশের ই-কমার্স খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ভিজিটর কমে গেছে ৫০-৬০% আর অর্ডার কমে গেছে ৬০-৭০%। আর শুধু মাত্র ফেসবুক নির্ভর উদ্যোগ গুলোর অবস্থা আরো করুন, তাদের প্রায় সকলেরই এখন পথে বসার মত অবস্থা। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষ ই-কমার্সের মত একটি সম্ভাবনাময় খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজকে আরো এগিয়ে নিতে অচিরেই ফেসবুকসহ সব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খুলে দিবেন বলে আশা করছি ।”

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিটিআরসির তথ্য মতে, গত অক্টোবরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ৫ কোটি ৪৬ লক্ষ ছাড়িয়েছে, যাদের মধ্যে ৫ কোটি ২৩ লক্ষ্য গ্রাহক মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো ফেসবুক, ভাইভার, হোয়াটস এপ সম্পর্কিত বিভিন্ন ডাটা প্যাক বিক্রি করে থাকে। গত প্রায় ৩ সপ্তাহ বন্ধের কারণে তাদের মোবাইল ডাটার ব্যবহার কমে গেছে ৩০%।

শীর্ষ ৩ মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, গত ১৭ নভেম্বরে যেখানে তাদের ব্যবহার করা ব্যান্ডউইথ এর পরিমাণ ছিল ২৯৬ টেরা বাইট তা গত ১৮ নভেম্বর ২২৯ টেরা বাইটে এসে দাঁড়িয়েছে।

গত ২৬ নভেম্বর কুমার দেবুল দে নামে একজন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ফেসবুক, ভাইভার, হোয়াটস এপের উপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। যদিও আজ (৬ ডিসেম্বর , ২০১৫) পর্যন্ত তার কোন ফল দেখতে পাওয়া যায় নি।

টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, “আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফেসবুকের দুই কর্মকর্তা ঢাকায় এসেছেন। আমাদের সমস্যাগুলো আমরা তাদের জানাব। তারাও এ ব্যাপারে ইতিবাচক বলে আমাদের জানিয়েছে। ফলে ওই বৈঠকে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে বলে আমি আশাবাদী।“ নারী ও শিশুর প্রতি অবমাননাকর বিষয়সহ সাইবার ক্রাইম রোধ এবং আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ৩০ নভেম্বর ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে ই-মেইলে চিঠি পাঠান তারানা হালিম। তার একদিন পর চিঠির জবাব দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ, যাতে আলোচনায় বাসার সময় নির্ধারণ করা হয়।

নিরাপত্তা আমাদের অনেক গুরুত্ব পূর্ণ একটি ইস্যু। তবে সরকার সামিয়ার মত আরো হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কথা মাথায় রেখে খুব শীঘ্রই ফেসবুক সহ সব সোশ্যাল সাইটগুলো খুলে দিবে বলে সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী।