গল্পের শুরু ১০ হাজার টাকায় !!!

riyad-1 final

চার বন্ধুকে নিয়ে  জিজিটাল মিডিয়া এজিন্সে ‘ম্যাগনিটো ডিজিটাল’ গড়ে তুলেছেন তরুন উদ্যেক্তা রিয়াদ শাহির আহমেদ হোসেন। ব্যবসার শুরুতেই লজিস্টিক সার্পোট ততটা না থাকায় এক প্রকার সংগ্রাম করতে হয় তাকে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে এখন ম্যাগনিটো ডিজিটাল এখন দেশের অন্যতম সেরা এজেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বাংলাদেশের নামকরা কিছু দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে গ্রামীণফোন, টেলিনর ডিজিটাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম, অ্যাপোলো হসপিটালস ও সিটি ব্যাংক অন্যতম। ভালো কাজের স্কীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ওয়ার্ল্ড ব্র্যান্ড কংগ্রেসের ‘এশিয়ার প্রভাবশালী ডিজিটাল মিডিয়া প্রফেশনাল পুরস্কার’। এছাড়া ক্যাম্পেইন এশিয়া প্যাসিফিকের রেস্ট অফ সাউথ এশিয়া ক্যাটাগরিতে ডিজিটাল এজেন্সি অফ দ্য ইয়ার ২০১৫ ও গোল্ড অ্যাওয়ার্ডে পুরস্কৃত হয়েছে ম্যাগনিটো ডিজিটাল। দেশীয় চারটি পুরস্কারও পেয়েছে এই ডিজিটাল মিডিয় এজেন্সি। রিয়াদ গুগল বিজনেস গ্রুপ ঢাকার কো-ফাউন্ডার এবং স্টার্টআপ এসডি এশিয়ার একজন বিনিয়োগকারী। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৪ সাল থেকে বেসিসের ওয়েব সলিউশন অ্যান্ড ই-মার্কেটিং সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পলন করছেন। আসন্ন বেসিস নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপণন ও ব্র্র্যান্ডিংয়ে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান রিয়াদ শাহির আহমেদ হুসাইন। মার্কেটিং থেকে বিবিএ করার পর তিনি সেখানে আর্কেডিয়া গ্রুপে গ্র্যাজুয়েট ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি কর্মসূচিতে যোগ দেন। এক বছর কাজ করেন সেখানে। একদিন সবকিছু  ছেড়ে বাংলাদেশে চলে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করা আমের খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিবিএতে পাশ করা মুনাজের চৌধুরীকে নিয়ে তাঁরা উদ্যোক্তা জীবন শুরু করেন।
২০০৭ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে দুই অংশীদারদের নিয়ে গুলশানে প্রিন্টিং ব্যবসা শুরু করেন। প্রায় দুই বছর পরিশ্রমের পর ২০০৯ সালে তাঁরা রুট মার্কেটিং সার্ভিস নামে একটি কমিউনিকেশন এজেন্সি শুরু করেন। আরও চার বছর পর রিয়াদ ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ শুরু করেন। রিযাদ, আমের ও মুনাজের মিলে  জনের টিম নিয়ে ২০১২ সালে দেশের অন্যতম প্রথম ডিজিটাল অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি হিসেবে ম্যাগনিটো ডিজিটালের যাত্রা শুরু করেন। ম্যাগনিটোর উদ্দেশ্য ছিল দেশের বাজারকে ডিজিটাল করার ব্যাপারে মানুষকে আগ্রহী করা এবং ছোট-বড় ব্যবসাকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। কিছুটা সময় লাগলেও রিয়াদ  বেশ কয়েকজন ভালো কর্মী পান। এক বছরের মাথায় ম্যাগনিটো ডিজিটাল ডিজিটাল স্ট্যাটেজি তৈরি থেকে শুরু করে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন করা, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ডিজিটাল মিডিয়া বায়িং, অ্যানিমেশন তৈরি, ভিডিও, অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েব ইন্টারফেসসহ আরও অনেক কিছু নিয়ে কাজ করে। কঠিন মনোবল, সততা, দক্ষতা ও দূরদর্শীতা তাঁকে আজকের অবস্থানে এনে দিয়েছে বলে জানান ম্যাগনিটো ডিজিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াদ শাহির আহমেদ হোসেন।
উদ্যোক্তা জীবন শুরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রিয়াদ হোসেন বলেন, ‘আমরা চার বছর আগে ম্যাগনিটো ডিজিটাল নামে একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি শুরু করি। আমার এই সেবা আইটি এনাবল সার্ভিসের মধ্যে পড়ে। আমরা দেখি দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে অনলাইনে বড় ধরনের চাহিদা তৈরী হবে মার্কেটিংয়ের।

আমরা ২০১২ সালে আমাদের প্রতিষ্ঠান চালু করি। এরপর থেকে আমরা বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় ও রক্ষণাবেক্ষনে কাজ করছি। তরুণ আইসিটি উদ্যোক্তা হওয়ার আহব্বান জানিয়ে ম্যাগনিটো ডিজিটালের কো-ফাউন্ডা ও সিইও বলেন, ‘আমি শুরু করেছি জিরো থেকে। আমি তরুণদের বলবো-পুঁজি ছাড়াও ব্যাবসা শুরু করা সম্ভব। এখন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমরা যেরকম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি তাতে এখনই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার সঠিক সময়। এই অবস্থা পাঁচ বছর আগে ছিল না। আইসিটি খাতে এখন ২৫০ মিলিয়ন রপ্তানি হয়। স্থানীয় বাজারে আরো ২৫০ মিলিয়ন ডলারের কাজ হয়। গত তিন বছরে আইসিটি খাত যে সম্প্রসারন হয়েছে তাতে এটি হাফ এ বিলিয়ন ডলারের খাতে পরিণত হয়েছে। এটা এখন ওপরের দিকে যাচ্ছে এবং যেতেই থাকবে। বর্তমান সরকার অনেকগুলো আইটি পার্ক তৈরীসহ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি এখন আরো দ্রুত হবে।
আইসিটি খাতের বিকাশে সরকারের আরো নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো সার্ভিস নির্ভর আছি। এটা ভালো, কিন্তু আমাদের নিজেদের প্রডাক্ট বানানোর সংস্কৃতি চালু করতে হবে। হোয়াটস অ্যাপকে যখন ফেসবুক কিনেছিল কারণ এটা প্রডাক্ট ছিল। নিজেদের প্রডাক্টকে সাপোর্ট করার জন্য সরকারের দায়িত্ব স্থানীয় সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিকে সুরক্ষা দেওয়া। এটা যদি হয় তাহলে আমাদের বড় কোম্পানি বিদেশ থেকে সফটওয়ার নিচ্ছে। কিন্তু দেখা যায়, আমাদের স্থানীয় কোম্পানিগুলোও  একই সফটওয়ার বানাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সরকার যদি সহয়তা করে তাহলে আমাদের স্থানীয় সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রি আরো বিকশিত হবে। এক্ষেত্রে বেসিসকে আরো কার্যকর ভ‚মিকা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু প্রডাক্টের দিকেই সবাই বেশি মনোযোগি, কিন্তু মার্কোটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে নয়। এটা যতোক্ষণ না হবে গ্রাহকদের আস্থা ততোদিন অর্জন করা যাবে না। এখন আমাদের আইসিটি খাত বড় হচ্ছে। তাই আমাদের প্রডাক্ট মার্কেটিং করতে হবে। আমাদের একটি বড় স্থানীয় বাজার আছে। এখানেও কোন ব্র্যন্ডিং করা হয় না। একটা সাবান বা পেষ্ট ব্র্যান্ডিং করে ভোক্তাদের মনে জায়গা করে নেই। বাংলাদেশে যারা সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছে তাদের প্রত্যেকটা সফটওয়্যার ও সেবাকে একেকটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা গ্রামীণফোনের ডিজিটাল ও লাইফ স্টাইল প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করি। তারা এই কাজটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মতোই করেছে। এই অ্যাপগুলোর ২০ থেকে ২৫ লাখ ব্যবহারকারী আছে যেটা বাংলাদেশের খুব কম প্রডাক্টেই আছে। এভাবে দেশের একেকটি সফটওয়্যার পণ্যকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে অবদান রাখতে চান বেসিস নির্বাচনে ডিজিটাল ব্রিগেড প্যানেলের এই প্রার্থী।
একটা ছোট স্টার্টআপ কোম্পানির পক্ষে এতো বড় বাজেট নিয়ে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ অন্তত আমাদের ব্র্যান্ডিংয়ের মানসিকতা ও অভ্যাসটা গড়ে তুলেতে হবে। মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, পলিসি সাপোর্ট, প্রশিক্ষণ এ সব কিছুর সমš^য়ে আমাদের স্থানীয় বাজারকে শক্তিশালি করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
২০১৪ সাল থেকে বেসিসের ওয়েব সলিউশন অ্যান্ড ই-মার্কেটিং সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পলন করছেন রিয়াদ হোসেন। তিনি বলেন, গত ৩-৪ বছর নয়, ২০ বছর ধরেই বেসিস খুব ভালো কাজ করছে। সরকার এখন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ’র মতো বেসিসকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্বাচিত হলে এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান বলে জানান তিনি।
তরুণদের নিয়ে তাঁর আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘তরুণ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই। সব কাজে তাদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে চাই। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলেই বেসিস এগিয়ে যাবে।’

*

*